ফলে খাতটির অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ সেবায় অর্থ বরাদ্দ কমে যাবে। এতে আগামী এক দশকে প্রায় ২ লাখ ২৯ হাজার অতিরিক্ত মৃত্যু ঘটতে পারে বলে এক গবেষণায় আশঙ্কা প্রকাশ করা হয়েছে। তবে যুক্তরাজ্য সরকার এ বিশ্লেষণের সঙ্গে একমত নয় এবং চুক্তিটিকে দেশের রোগী ও ব্যবসার জন্য ইতিবাচক বলে দাবি করেছে। খবর সিএনএন।
যুক্তরাজ্য ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে গত ডিসেম্বরে একটি বাণিজ্য চুক্তি হয়। ওই চুক্তির আওতায় আগামী ১০ বছরে নতুন ওষুধের পেছনে যুক্তরাজ্যের ব্যয় জিডিপির দশমিক ৩ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে অন্তত দশমিক ৬ শতাংশে উন্নীত করার বিষয়ে সম্মত হয় লন্ডন। এ চুক্তি ছিল মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রস্তাবিত শুল্ক এড়ানোর বৃহত্তর কৌশলের অংশ।
এর বিনিময়ে যুক্তরাষ্ট্র আগামী তিন বছর ব্রিটিশ ওষুধ ও চিকিৎসা সরঞ্জাম রফতানির ওপর নতুন শুল্ক আরোপ করবে না বলে আশ্বাস দেয়। এর আগে গত সেপ্টেম্বরে ট্রাম্প যুক্তরাষ্ট্রে আমদানি করা কিছু ওষুধের ওপর ১০০ শতাংশ পর্যন্ত শুল্ক আরোপের হুমকি দেন।
চিকিৎসাবিষয়ক সাময়িকী ব্রিটিশ মেডিকেল জার্নালে (বিএমজে) গত সপ্তাহে প্রকাশিত এক বিশ্লেষণে বলা হয়, নতুন ওষুধের ব্যয় মেটাতে ২০৩৬ সালের মধ্যে যুক্তরাজ্যের সরকারি স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থা ন্যাশনাল হেলথ সার্ভিসকে (এনএইচএস) অতিরিক্ত প্রায় ৪৫ বিলিয়ন পাউন্ড ব্যয় করতে হতে পারে।
গবেষণাটি পরিচালনা করেছেন যুক্তরাজ্যের ইয়র্ক বিশ্ববিদ্যালয়, লিভারপুল বিশ্ববিদ্যালয় ও নিউজিল্যান্ডের ক্রাইস্টচার্চ হাসপাতালের গবেষকরা।
তাদের মতে, সরকারি অর্থায়নে পরিচালিত স্বাস্থ্য ব্যবস্থায় বাজেট সীমিত থাকে। ফলে কোনো একটি খাতে ব্যয় বাড়লে অন্য খাতের ব্যয় কমানোর প্রয়োজন হয়।
বিশ্লেষণে বলা হয়, সরকার যদি স্বাস্থ্য খাতে অতিরিক্ত অর্থ বরাদ্দ না দেয়, তাহলে এনএইচএসের অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ সেবা থেকে অর্থ সরিয়ে নিতে হতে পারে। ফলে আগামী বছরগুলোয় প্রায় ২ লাখ ২৯ হাজার অতিরিক্ত মৃত্যু ঘটতে পারে। একই সঙ্গে দেশে স্বাস্থ্যসেবায় বৈষম্যও আরো বাড়তে পারে।
গবেষকদের মতে, এ অতিরিক্ত মৃত্যুর বড় অংশজুড়ে থাকবে হৃদরোগ, শ্বসনতন্ত্রের রোগ, পরিপাকতন্ত্রের জটিলতা ও ক্যান্সারে আক্রান্ত রোগীরা। কারণ এসব রোগের চিকিৎসা ও সেবা খাতে ব্যয় সংকোচনের প্রভাব সবচেয়ে বেশি পড়তে পারে।
যুক্তরাজ্য সরকার এ বিশ্লেষণের উপসংহারের সঙ্গে একমত নয়। সরকার যুক্তরাষ্ট্র-যুক্তরাজ্য বাণিজ্য চুক্তিকে একটি ‘ঐতিহাসিক’ বা ‘ল্যান্ডমার্ক’ চুক্তি হিসেবে বর্ণনা করেছে। সরকারের দাবি, চুক্তিটি ওষুধ সরবরাহ নিশ্চিত করবে এবং রোগী ও ব্যবসা খাতে নতুন বিনিয়োগ বাড়াতে সহায়তা করবে।
যুক্তরাজ্যের স্বাস্থ্য ও সামাজিক সেবা বিভাগের মুখপাত্র জানান, বিশ্লেষণে উল্লেখ করা ৪৫ বিলিয়ন পাউন্ড অতিরিক্ত ব্যয়ের হিসাব সরকার স্বীকার করে না। তার ভাষ্য, ২০২৫ সালের ব্যয় পর্যালোচনার সময় এ খাতে প্রয়োজনীয় অর্থ সংরক্ষণ করা হয়েছে। ভবিষ্যতের অর্থায়নের বিষয়টি পরবর্তী বাজেট পর্যালোচনায় নির্ধারণ করা হবে।
সরকারের দাবি, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে অংশীদারত্বের ফলে ওষুধের মূল্যনির্ধারণ পদ্ধতিতে পরিবর্তন আনা সম্ভব হয়েছে। ফলে এনএইচএসের রোগীরা এমন কিছু নতুন ওষুধ ব্যবহারের সুযোগ পাবেন, যা আগে তাদের নাগালের বাইরে ছিল।
তবে গবেষকরা চুক্তিটির আরেকটি মৌলিক ধারণা নিয়েও প্রশ্ন তোলেন। তাদের মতে, ট্রাম্পের প্রস্তাবিত শুল্ক এড়ানোর ফলে যুক্তরাজ্যের অর্থনীতি বড় ধরনের সুবিধা পাবে, এমন ধারণার পক্ষে পর্যাপ্ত প্রমাণ নেই।
বিশ্লেষণে বলা হয়, যুক্তরাজ্য ওষুধের ক্ষেত্রে এখনো নিট আমদানিকারক দেশ। ফলে অতিরিক্ত ব্যয়ের বড় অংশ বহুজাতিক ওষুধ কোম্পানিগুলোর কাছে চলে যাবে।
গবেষকদের হিসাব অনুযায়ী, ২০৩১ সালের মধ্যেই চুক্তিটির কারণে যে অতিরিক্ত ব্যয় হবে, তা যুক্তরাষ্ট্রে যুক্তরাজ্যের মোট বার্ষিক ওষুধ রফতানির মূল্যের চেয়েও বেশি হতে পারে। ফলে চুক্তির আর্থিক লাভ-ক্ষতি নিয়ে ভবিষ্যতে আরো বড় বিতর্ক তৈরি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।